লাল চিনিই হতে পারে প্রচলিত সাদা চিনির বিকল্প

By Taajataja

চিনি এতই  নিত্যপ্রয়োজনীয় যে , চা, কফি, চকলেট , জুস, ফিরনি , পায়েস , মিষ্টান্ন ছাড়াও কোন কোন তরকারি রান্নায়ও টেস্টিং সল্টের পরিবর্তেও চিনি ব্যবহৃত হয়। চিনি যেন আমাদের জীবনেরই একটি অঙ্গ। কিন্তু চিনিকেই এখন বলা হচ্ছে  White Poison বা সাদা বিষ। কেনই বা সাদা চিনি কে আমরা বিষ বলছি ?

কারণ সাদা চিনি  বিষের মত আমাদের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়।  চিনি আমাদের দেহের জন্য কতখানি ক্ষতিকর তা আমরা সহজে টের পাই না , কারণ চিনির ক্ষতিকর প্রভাবগুলো খুব অল্প সময়ে চোখে ধরা পড়ে না তাই আমরা সহজে বিশ্বাস করি না যে, চিনি আমাদের দেহের জন্য ক্ষতিকর।

আর ডায়াবেটিস রুগীদের জন্য  চিনি কি যে ক্ষতিকর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথিবীতে যতগুলো রিফাইন ফুড পাওয়া গেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হচ্ছে চিনি। এসকল কারণেই চিনিকে বলা হয় সাদা বিষ (হোয়াইট পয়জন)!

সাদা চিনি যদি এতই খারাপ তা হলে উপায় কি ?

উপায় হল লাল চিনি । আবার বাজারে যে লাল চিনির মত যে ব্রাউন সুগার পাওয়া যায় তা মূলত অপরিশোধিত সাদা চিনিরই একটি ভ্যারাইটি, তাতে সাদা চিনির সাথে কিছু গুড়ের উপাদান মিশ্রিত থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রাউন সুগারও শিল্পে উৎপাদিত চিনিই।

তাই সাদা চিনির প্রকৃত বিকল্প  হিসেবে খাবারে  লাল চিনি, আখের গুড়, খেজুর গুড় , স্টেভিয়া  (এক প্রকার মিষ্টি গুল্ম জাতীয় ভেষজ গাছ) , ঝোলা গুড় ইত্যাদি  ব্যবহার করা যেতে পারে।  

এতে শরীর পাবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি-৬, আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম।  আর বেঁচে যাবেন আপনি বিভিন্ন জটিল শারীরিক সমস্যা থেকে। 

আর গুড় সবসময় ভাল না লাগলে মাঝে মাঝে  আখের রস খেতে পারেন৷ 

দুপুরে বা রাত্রে খাওয়ার পর মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে হলে, খেজুর , কিসমিস বা অন্য শুকনো ফল । খেতে পারেন বিভিন্ন টাটকা ফল৷

সাধারণ চিনির বদলে আমাদের লাল চিনি অথবা খেজুরের গুড় দিয়ে কেক বা পুডিং ইত্যাদি বানানো যায় ৷

পুডিং বা কাস্টার্ডে সাদা চিনির বদলে মেশান  আমাদের লাল চিনি ও বিভিন্ন ফল।

গ্রিন টি আসলে কোন চিনি  ছাড়াই  সবচেয়ে ভাল, তবে খেতে ভাল না লাগলে মেশাতে পারেন সামান্য খাঁটি মধু ৷ 

আমাদের লাল চিনি কেন প্রচলিত সাদা চিনির বিকল্প হতে পারে, সে সম্পর্কে জানতে হলে লেখাটি শেষ  পর্যন্ত পড়ার জন্য অনুরোধ রইল এবং এ সম্পর্কে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।

প্রাগৈতিহাসিক কালে চিনি ছিল না, তার পরিবর্তে ছিল মধু আর মিষ্টি ফল। এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা দিচ্ছেন চমকপ্রদ নানা মজার তথ্য। আজ থেকে প্রায় ৮০,০০০ বছর আগের কথা,  এযুগে যেটি কল্পনা করাই কঠিন, তখন মানুষ কেবল বছরে কয়েক বার চিনি খেতে পারত ।

কারণ তখন চিনির মূল উৎস ছিল মৌসুমি ফল, আর সেই ফল ছিল বনে জঙ্গলে বিক্ষিপ্তভাবে এবং মানুষকে তা সংগ্রহ করতে হতো অনেক কষ্ট করে, কারণ বিভিন্ন রকম পশু-পাখি ছিল তাঁদের প্রতিযোগী।

ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বেও কেবল ধনী ব্যক্তিরা চিনি খেতে পারতেন।  আবার এক সময়ে চিনি শুধু চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হত। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের কল্যাণে চিনি এখন এত সহজ লভ্য যে, আমরা চিনি নামের সেই সাদা বিষ প্রতিনিয়ত কোন না কোন ভাবে খেয়েই যাচ্ছি।

আমরা এখন প্রায় সকলেই জানি শিল্প উৎপাদিত সাদা চিনি বিষ সমতুল্য , কিন্তু সেই সাদা চিনিই আবার প্রতিনিয়ত খেয়ে যাচ্ছি। কারণ আমাদের সামনে  তেমন কোন ভাল বিকল্প নাই। বিকল্প হিসাবে যা কিছু আছে তা হয়ত খুবই দামী এবং স্বাদ ও তেমন মজাদার না। 

তাহলে সাদা চিনি যদি এতই খারাপ তা হলে উপায় কি ? একটি ভাল উপায়  “লাল চিনি” ।

কি এই লাল চিনি ?

এক কথায় লাল চিনিকে আমরা অর্গানিক আঁখের রসের পাউডার বলতে পারি। যা তৈরি হয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে ঘরোয়া পদ্ধতিতে ও  স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে। যা কোন মেশিনের সাহায্যে তৈরি করা হয় না বা রিফাইন করা হয় না। আমাদের জানা মতে এই লাল চিনি  শুধুমাত্র ময়মনসিংহ জেলায় তৈরি হয়।

অন্য কোন জেলায় তৈরি না হওয়ার কারণে বাইরে লাল চিনি তেমন কেউ চেনেন না। ইংরেজ শাসন আমলের উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলাদেশের প্রস্তুত লাল চিনি প্রচুর পরিমাণে ব্রিটেনে রপ্তানি হতো।    

এই চিনি তৈরি করতে প্রথমে আঁখ থেকে রস বের করা হয়, তারপর চুলায় জ্বাল দিতে দিতে সে রস শুকিয়ে ফেলা হয়। শুকানোর পর সেই রস অনেকটা পাউডারের মত হয়ে যায়। সেই পাউডার মসলিন কাপড় দিয়ে চেলে মিহি পাউডার গুলি আলাদা করা হয়। এই পাউডারই হল বাংলাদেশের বিখ্যাত “লাল চিনি”।

চিনির বিকল্প হিসাবে লাল চিনি যে কোন ভাবে ব্যবহার করতে পারবেন; যেমন চা, কফি, জুস, ফিরনি, পায়েস , মিষ্টান্ন, শরবতে । 

কঠোর পরিশ্রম বা বাইরে কাজ করে গরমে বাসায় ফেরার পর যদি আপনি লাল চিনির শরবত খান আপনার সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে নিমিষেই।

লাল চিনি পিঠা এবং আচার তৈরিতেও ব্যবহার করতে পারবেন । 

স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতার নজর এখন আখের চিনিতে। লালচে রঙের এই চিনি স্বাস্থ্যকর হওয়া সত্ত্বেও এতদিন ভুল ধারণা থেকে এড়িয়ে চলা হতো। খোঁজ করা হতো বিট থেকে উৎপাদিত ঝকঝকে, মিহি দানার সাদা চিনি।

তবে এ প্রবণতা পুরোপুরি দূর না হলেও ভোক্তার রুচি-বোধ দিনদিন বদলে যাচ্ছে। তাদের কাছে কদর বাড়তে শুরু করেছে লাল চিনি, গুড় , খেজুরের রস ইত্যাদি।

সাদা চিনির তুলনায় পরিমাণে কম ব্যাবহার করলেও কাঙ্ক্ষিত মিষ্টতা পাওয়া যায় বলে দাম একটু বেশি হলেও  পুষিয়ে যায়।

সাদা দানাদার অতি স্বচ্ছ যে উপাদানকে আমরা চিনি বলে জানি তা সম্পূর্ণ অ-প্রাকৃতিক একটি উপাদান যা আখ বা বিট থেকে তৈরি হয়।

শিল্পকারখানায় রিফাইনিং পদ্ধতিতে চিনি তৈরি করার সময় ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন, এনজাইম এবং অন্যান্য উপকারী পুষ্টি উপাদান দূর হয়ে যায় যা স্বাভাবিকভাবেই একটি গাছে থাকে।

বর্তমান ভেজালের যুগে এখানেও কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল করে। আমরা ভেজাল মুক্ত আসল লাল চিনি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

কি ভাবে চিনবেন ভেজাল মুক্ত লাল চিনি ?    

ভাল মানের লাল চিনি তে কোন দানাদার চিনি থাকবে না। ভাল লাল চিনির রং হবে  বাদামী সোনালি রঙ্গয়ের মাঝামাঝি । আর হবে পাউডারের মত মিহি।

সুতরাং আপনি সাদা চিনি কেন খাবেন? চিনিতে নেই কোনও প্রোটিন, নেই কোনও মিনারেল, নেই কোনও ফাইবার। যা আছে তার প্রায় সবই শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের জন্য “লাল চিনি” হতে পারে সাদা চিনির সবচেয়ে ভাল বিকল্প। এতে আমাদের স্বাস্থ্য যেমন রক্ষা পাবে আর বেঁচে থাকবে গ্রামীণ প্রান্তিক কৃষক ।  আর কৃষি , কৃষক ও  স্বাস্থ্য রক্ষায় কিছু টাকা না হয় বেশিই খরচ করলেন । 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Item added To cart
X